
নিজস্ব প্রতিবেদক
জ্বালানি তেলের সংকট যে নেই—এটা যেমন পুরোপুরি সত্য নয়, তেমনি এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই সংকটকে আমরা নিজেরাই অনেক ক্ষেত্রে আরও তীব্র করে তুলছি। বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক বাজার, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি—এসব কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। কিন্তু সেই চাপকে সংকটে রূপ দেয় আমাদের আচরণ, ব্যবস্থাপনা এবং মানসিকতা।
প্রথমত, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত মজুত করার প্রবণতা একটি বড় সমস্যা। যখনই তেলের দাম বাড়ার খবর বা সরবরাহে ঘাটতির গুজব ছড়ায়, তখন অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি কিনে জমা রাখতে শুরু করে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। প্রকৃতপক্ষে, সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও চাহিদার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, অপচয় আমাদের একটি গভীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজন না থাকলেও গাড়ি ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ, যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইঞ্জিন চালু রাখা—এসব আচরণ জ্বালানির ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে। একটি জাতি হিসেবে আমরা যদি সাশ্রয়ী হওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারি, তবে যেকোনো সরবরাহই একসময় অপ্রতুল মনে হবে।
তৃতীয়ত, নীতিগত দুর্বলতা ও অনিয়মও সংকট বাড়ায়। অনেক সময় বাজারে সিন্ডিকেট, মজুতদারি এবং কালোবাজারির কারণে প্রকৃত চিত্র বিকৃত হয়। তেলের ঘাটতি যতটা না বাস্তব, তার চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে ‘ব্যবস্থাপনার সংকট’। সঠিক তদারকি এবং স্বচ্ছতা না থাকলে, সামান্য চাপও বড় সমস্যায় রূপ নেয়।
চতুর্থত, বিকল্প জ্বালানির প্রতি অনীহাও একটি কারণ। আমরা এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। সৌরশক্তি, বৈদ্যুতিক যান বা অন্যান্য টেকসই সমাধান গ্রহণে ধীরগতি আমাদের সংকটকে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী করে তুলছে।
সবশেষে, এই সংকট কেবল সরকারের বা বৈশ্বিক পরিস্থিতির দায় নয়—এটি আমাদের সম্মিলিত আচরণের প্রতিফলন। সচেতন ব্যবহার, গুজব থেকে দূরে থাকা, সঠিক নীতির প্রয়োগ এবং বিকল্প শক্তির দিকে ঝোঁক—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে জ্বালানি সংকট অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
অতএব, জ্বালানির সংকট যেমন বাস্তব, তেমনি এটাও বাস্তব যে আমরা নিজেরাই সেই সংকটকে বাড়িয়ে দিচ্ছি—কখনো অজান্তে, কখনো অভ্যাসবশত। পরিবর্তনটা শুরু করতে হবে আমাদের নিজেদের থেকেই।
আল আমিন মিলু
লেখক কলামিস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আহ্বয়ক গনঅধিকার পরিষদ সরিসাবাড়ি উপজেলা শাখা জামালপুর