
নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ ২৩ মাস বন্ধ থাকার পর দ্বিগুণ দামে গ্যাস কিনে উৎপাদনে ফেরানো হয়েছিল দৈনিক ১৭ শ’ মে. টন ইউরিয়া উৎপাদন ক্ষমতাসমপন্ন দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল)। সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল—এবার টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত হবে। কিন্তু এক মাস না পেরোতেই গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবারও বন্ধ হয়ে গেছে কারখানার নিয়মিত উৎপাদন।
এর ফলে জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইলসহ উত্তরবঙ্গের ১৯ জেলার কৃষকের সার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ছে আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন এ কারখানায় গত ২৪ নভেম্বর ২০২৫ গ্যাস সংযোগ দেয় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। পরে ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ কারখানা কর্তৃপক্ষ উৎপাদনে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু ২২ জানুয়ারি ২০২৬ গ্যাসের চাপ ৮ কেজিতে নেমে গেলে বয়লার স্ট্রিপ করে উৎপাদন সাময়িক বন্ধ করা হয়। পরে ১৫ ফেব্রুয়ারি চাপ আরও কমে ৫ দশমিক ২ কেজিতে নামলে পুরো কারখানাই অচল হয়ে পড়ে।
কারখানার জিএম (অপারেশন) মো. ফজলুল হক বলেন,“১৫ ফেব্রুয়ারি গ্যাসের চাপ ৫ দশমিক ২ কেজিতে নেমে এলে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হই। ১৭ ফেব্রুয়ারি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, রমজান মাসে কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সম্ভব নয়।” কবে নাগাদ উৎপাদন স্বাভাবিক হবে—এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট জবাব দিতে পারেননি তিনি।
কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু হলে দ্রুত উৎপাদনে ফেরার সক্ষমতা রয়েছে কারখানার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্যাসের চাপ সল্পতার মধ্যেও কারখানাটির দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ১,২০০ মেট্রিক টন। সেই হিসাবে এক মাস (৩০ দিন) চালু থাকলে সম্ভাব্য উৎপাদন হতো ৩৬ হাজার মেট্রিক টন।
এই পরিমাণ সার আমদানি করতে হলে প্রতি টন ৮৮ হাজার টাকা হিসাবে ব্যয় হবে প্রায় ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ স্থানীয়ভাবে একই পরিমাণ সার উৎপাদনে খরচ হতো প্রায় ৭৯ কোটি ২০ লাখ টাকা (প্রতি টন ২২ হাজার টাকা হিসাবে)।
অর্থাৎ এক মাস উৎপাদন বন্ধ থাকলে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এই বাড়তি ব্যয় সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশন (বিএফএ) জামালপুর জেলা শাখার সাবেক সভাপতি চান মিয়া চানু বলেন, “লাভজনক যমুনা সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ হলে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। যমুনার সার গুণগত মানে ভালো, তাই কৃষকের চাহিদাও বেশি। উৎপাদন বন্ধ মানেই আমদানির ওপর নির্ভরতা।”
তিনি বলেন, অতীতে নিম্নমানের আমদানি সার নিয়ে কৃষক, ব্যবসায়ী ও সরকার—সবাই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল।
বিএফএ রাজশাহী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সরদার বলেন, “যমুনা কারখানার উৎপাদিত সার উন্নতমানের হওয়ায় কৃষকের চাহিদা বেশি। আমরা ডিলাররা এই সার বিক্রি করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। উৎপাদন বন্ধ মানেই বাজারে চাপ। তখন আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। অতীতে আমদানি করা সার নিয়ে মান ও দামের অভিযোগ ছিল—কৃষক যেন আবার ক্ষতিগ্রস্ত না হন।”
কারখানা সূত্র জানায়, রমজান মাসে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব নয় বলে তিতাস কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া কেন উৎপাদন শুরু করা হলো?
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত অস্থিরতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বারবার বিপর্যস্ত হচ্ছে। দ্বিগুণ দামে গ্যাস কিনেও যদি টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা না যায়, তবে তা কেবল আর্থিক নয়, নীতিগত ব্যর্থতারও ইঙ্গিত দেয়।
দৈনিক ১,২০০ টন উৎপাদন সক্ষম একটি কারখানা বন্ধ থাকা মানে শুধু রাজস্ব ক্ষতি নয়—কৃষি উৎপাদন, বাজার স্থিতি ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ। দ্রুত কার্যকর সমাধান না এলে এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষিখাত ও বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডারে—এমন আশঙ্কাই এখন শিল্প ও কৃষি মহলে।