
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শক্তি ক্ষমতা নয়—মানবিকতা। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ হতে পারে, যখন নেতৃত্বের কেন্দ্রে থাকে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, সহমর্মিতা এবং নৈতিক সাহস। আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে—রাষ্ট্রযন্ত্র কি জনগণের জন্য, নাকি জনগণই রাষ্ট্রের ভয়ে বাস করে?
যে নেতৃত্ব জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তারা ধীরে ধীরে বাস্তবতা হারিয়ে ফেলে। মানুষের কষ্ট, দুঃখ, বঞ্চনা—এসব তখন আর তাদের বিবেচনায় স্থান পায় না। ফলে সিদ্ধান্তগুলো হয়ে ওঠে একমুখী, কঠোর এবং অনেক সময় জনবিরোধী। একজন নেতা যদি জনগণের মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পান, তাদের প্রশ্ন শুনতে অস্বস্তি বোধ করেন, তাহলে সেই নেতৃত্বের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
ইতিহাস বলে, যে শাসক জনগণের ভালোবাসা হারায়, সে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ভয় আর দমন-পীড়ন দিয়ে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলেও, তা কখনোই স্থায়ী শান্তি এনে দিতে পারে না। বরং এতে করে সমাজে জমে ওঠে ক্ষোভ, অবিশ্বাস এবং বিভাজন। এই পরিস্থিতি একটি রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়।
মানবিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—শোনার ক্ষমতা। একজন সত্যিকারের নেতা জানেন, প্রতিটি মানুষের কথা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিরোধী মতকেও সম্মান করেন, সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখেন না বরং তা থেকে শিক্ষা নেন। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, যেখানে জনগণ নিজেকে রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে অনুভব করে।
আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সংকট হলো—ক্ষমতাকে সেবার পরিবর্তে কর্তৃত্ব হিসেবে দেখা। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন ঘটবে না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন একজন কৃষক, একজন শ্রমিক, একজন সাধারণ নাগরিক তার জীবনে পরিবর্তন অনুভব করে।
এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—আমরা কেমন নেতৃত্ব চাই? এমন নেতৃত্ব, যারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে, না কি এমন নেতৃত্ব, যাদের সামনে দাঁড়াতে মানুষ ভয় পাবে? রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যদি মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার কিংবা উন্নয়ন—সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
সবশেষে বলা যায়, একটি দেশের শান্তি ও অগ্রগতি নির্ভর করে তার নেতৃত্বের মানসিকতার ওপর। যদি সেই মানসিকতা হয় মানবিক, সহানুভূতিশীল এবং দায়িত্বশীল—তাহলেই কেবল একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যথায়, ক্ষমতার প্রাচীর যতই উঁচু হোক, তা ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে গণবিস্ফোরণের কারণ হয়ে যায়।
আসুন মানবিক হই,জনগনের ভরসার মানুষ হই,শান্তি এবং সমৃদ্ধির রাষ্ট্র গড়ি।
লেখক কলামিস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক সরিসাবাড়ি জামালপুর