নিজস্ব প্রতিবেদক
সরিষাবাড়ী উপজেলায় টিআর ও কাবিখা–কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্নমানের ও অসম্পূর্ণ কাজ করে কাগজে-কলমে প্রকল্প শতভাগ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
উপজেলার আওনা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) এবং ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা/কাবিটা) প্রকল্পের অনেক কাজই নির্ধারিত মান অনুযায়ী হয়নি। কোথাও আংশিক ইটের সলিং, আবার কোথাও লোক দেখানো কাজ করে প্রকল্প শেষ দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওনা ইউনিয়নে একাধিক সড়ক উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নগদ বরাদ্দভিত্তিক প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—চাঁনপুর ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন রাস্তা থেকে তরফদার বাড়ি মসজিদগামী সড়কে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, বেলতলা মোড় থেকে রেললাইনগামী সড়কে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, চান্দুর মোড় থেকে দীপনের বাড়িগামী সড়কে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, আবুল হোসেনের বাড়ি থেকে পদ্মবিল মসজিদগামী সড়কে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, রেললাইন থেকে সালামের বাড়ি পর্যন্ত সড়কে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা, ১ নম্বর পঞ্চাশী পাকা রাস্তা থেকে রেজাউলের বাড়িগামী সড়কে ২ লাখ টাকা, পঞ্চাশী মেহের আলীর বাড়ির রাস্তা থেকে বাবলু মিয়ার রাইসমিলগামী সড়কে ৩ লাখ টাকা, কুড়ালিয়া পুটল গ্রামের মেইন রাস্তা থেকে নদীপাড়গামী সড়কে ২ লাখ টাকা, কাশীনাথপুর হাওয়া ভবন থেকে দানেশ পালোয়ানের বাড়িগামী সড়কে ২ লাখ টাকা, কাবারিয়াবাড়ি বাজারের সংযোগ সড়কে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, বাটিকামারী এলাকা থেকে ঈদগাহ মাঠগামী সড়কে ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা এবং কুলপাল কবরস্থানের সংযোগ সড়কে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
অন্যদিকে খাদ্যশস্যভিত্তিক (কাবিখা/কাবিটা) প্রকল্পের আওতায় কুমারপাড়া পাকা রাস্তা থেকে টুনুর দোকানগামী সড়কে ৯ দশমিক ৫ মেট্রিক টন গম এবং চান্দুর মোড় থেকে দীপনের বাড়ি ও নতুন ঘাট কলোনি মসজিদ পর্যন্ত সড়ক সংস্কারে ৯ দশমিক ৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রকল্পের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজ আংশিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে অথবা নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে।
চান্দুর মোড় থেকে দীপনের বাড়িগামী সড়কের সুবিধাভোগী দীপন মিয়া বলেন, “মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ফুট রাস্তায় ইট বসিয়ে পুরো প্রকল্প শেষ দেখানো হয়েছে। এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।”
প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তাঁকে কাগজে-কলমে সভাপতি দেখানো হলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। পরে তাঁকে ডেকে বিল সংক্রান্ত কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে আওনা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মিনারা আশরাফ তরফদারের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইউনিয়ন পরিষদের সচিব রাসেল মাহমুদ বলেন, “চলমান ১৬টি প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের বিলও তোলা হয়েছে।”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) শওকত জামিল বলেন, “প্রথম কিস্তির বিল দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি প্রকল্পের কাজ নিম্নমানের হওয়ায় দ্বিতীয় কিস্তির বিল আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।”
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সরকারি অর্থের অপচয় অব্যাহত থাকবে। তারা স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাঠপর্যায়ে তদারকির ঘাটতি ও জবাবদিহির অভাব থাকায় টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য গ্রামীণ জনগণের জীবনমান উন্নয়ন হলেও সরিষাবাড়ীর বর্তমান চিত্র সেই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।