
নিজস্ব প্রতিবেদক
জামালপুরে ডিজেল সংকটে থমকে গেছে সেচ কার্যক্রম। জ্বালানি না পেয়ে বন্ধ হয়ে পড়েছে হাজারো সেচপাম্প। ফলে পানি না পেয়ে ফেটে যাচ্ছে মাঠ, শুকিয়ে যাচ্ছে ধান ও ভুট্টার খেত। চলতি বোরো মৌসুমে বড় ধরনের উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কা করছেন কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা।
জামালপুর সদর উপজেলার চরচন্দ্রা এলাকার কৃষক মোহাম্মদ বজলু শেখ (৬৫) চার বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। কয়েক দিন আগে একবার সেচ দিলেও তীব্র রোদে সেই পানি দ্রুত শুকিয়ে যায়। এখন জমির মাটি ফেটে গেছে, ধানের চারা বিবর্ণ হয়ে পড়ছে। খেতের পাশে সেচপাম্প থাকলেও ডিজেলের অভাবে তা চালানো যাচ্ছে না।
বজলু শেখ বলেন, ‘তেলের জন্য পাম্পে বারবার যাই, কিন্তু পাই না। কখনো এক-দুই লিটার দেয়, এতে সেচ হয় না। ধান এখন থোড় হওয়ার সময়—এই সময় পানি না পেলে ফলন কমে যাবে।’
শুধু বজলু শেখ নন, জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে একই চিত্র। সরেজমিনে সদর উপজেলার ঝিনাই নদের পূর্বপাড়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ধানখেতজুড়ে শুকনো ফাটল। অনেক খেতে সেচপাম্প অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
একই এলাকার কৃষক মো. মামুন মিয়া বলেন, ‘নিজের পাম্প আছে, পাঁচ বিঘা জমিতে সেচ দিই। কিন্তু তেলের অভাবে পাম্প চালাতে পারছি না। কোনো দিন পানি দিতে পারলেও আবার কয়েক দিন বন্ধ থাকে। ধানের খেত শুকিয়ে যাচ্ছে।’
মেলান্দহ উপজেলার চার নম্বর চর এবং সরিষাবাড়ীর আওনা ঘুইঞ্চা চরের কৃষকেরাও একই সংকটের কথা জানিয়েছেন। ভুট্টা চাষি দুলাল মিয়া (৫৫) বলেন, ‘৩০ বিঘা জমিতে ভুট্টা করেছি। গাছে থোড় এসেছে। এখন পানি না পেলে বড় ক্ষতি হবে। এই অবস্থায় আমরা দিশেহারা।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার ১৩২ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। জেলায় প্রায় ৩৬ হাজার ডিজেলচালিত ও ১৯ হাজার ৭০০ বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প রয়েছে। তবে চরাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো সেচের প্রধান ভরসা ডিজেলচালিত পাম্প।
কৃষকেরা অভিযোগ করছেন, খুচরা বাজারে ডিজেলের সরবরাহ অপ্রতুল। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের চাপের কারণে কৃষকেরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
তবে প্রশাসনের দাবি, শৃঙ্খলা বজায় রেখে তেল বিতরণের চেষ্টা চলছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী বলেন, ‘কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে যানবাহনের চাপের কারণে কিছু সমস্যা হচ্ছে।’
অন্যদিকে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক কৃষক উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে তেল সংগ্রহের উদ্যোগ নিচ্ছেন না। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানান, ‘সমন্বয়ের মাধ্যমে তেল সরবরাহ সহজ করা সম্ভব। বিষয়টি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, বোরো ধানের থোড় ও শীষ গঠনের সময় নিয়মিত সেচ অত্যন্ত জরুরি। এ সময় পানি না পেলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। একইভাবে ভুট্টার ক্ষেতেও এই পর্যায়ে পানি সংকট উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা বলছেন, দ্রুত ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চলতি মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে কৃষি। ইতোমধ্যে অনেক খেতে তার প্রভাব দৃশ্যমান।