নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার সাথে তাল মিলিয়ে অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্তকে এক সময় যুগান্তকারী হিসেবে দেখা হয়েছিল। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় এটি ছিল সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে প্রশ্ন উঠছে—এই অনলাইন শিক্ষা কি সত্যিই আমাদের শিক্ষার্থীদের উপকারে এসেছে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে?
প্রথমত, অনলাইন ক্লাস শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল বিমুখতা বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে স্কুল ছিল সামাজিকীকরণ, শৃঙ্খলা ও মানসিক বিকাশের জায়গা, সেখানে অনলাইন ক্লাস শিক্ষার্থীদের ঘরবন্দি করে ফেলেছে। অনেক শিক্ষার্থীই এখন নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণে অনীহা প্রকাশ করছে। ফলে তাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত বৈষম্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের শিক্ষার্থীরা যেখানে ইন্টারনেট ও স্মার্ট ডিভাইসের সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে অনলাইন ক্লাস এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, যা শিক্ষার সমতা নীতির পরিপন্থী।
তৃতীয়ত, অভিভাবকদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অনলাইন ক্লাসে ছোট শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে গিয়ে অনেক অভিভাবকই বিপাকে পড়ছেন। বিশেষ করে যারা প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত নন, তাদের জন্য এটি একপ্রকার মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চতুর্থত, শিক্ষকদের শাসনের অধিকার সীমিত হয়ে গেছে। শ্রেণিকক্ষে সরাসরি উপস্থিত না থাকায় শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছেন না। এর ফলে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে এবং শিক্ষার গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—শিক্ষার্থীদের অবসর সময়ের অপব্যবহার। অনলাইন ক্লাসের নামে মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী মাদকের দিকে ঝুঁকছে বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এটি শুধু শিক্ষা নয়, পুরো সমাজের জন্যই একটি অশনিসংকেত।
তবে, একপাক্ষিকভাবে অনলাইন ক্লাসকে দোষারোপ করাও ঠিক নয়। এটি একটি আধুনিক মাধ্যম, যা সঠিক পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কার্যকর হতে পারত। কিন্তু আমাদের প্রস্তুতির অভাব, পর্যাপ্ত নজরদারির ঘাটতি এবং বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীন সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে এই উদ্যোগ আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
পরিশেষে বলা যায়, অনলাইন ক্লাস নিজে খারাপ নয়, বরং এর বাস্তবায়নের দুর্বলতাই সমস্যার মূল। এখন সময় এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর—যেখানে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও সমতা বজায় রেখে। অন্যথায়, আমরা হয়তো একটি প্রজন্মকে হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে যাবো।
শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন বাস্তবমুখী ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
লেখক গবেষক কলামিস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সরিষাবাড়ি জামালপুর