নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো সংবিধান। এটি একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন, যেখানে নাগরিকের অধিকার, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারিত থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সংবিধান কি আজও শুধুই জনগণের অধিকার রক্ষার হাতিয়ার, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটিই হয়ে উঠছে ক্ষমতার ঢাল?
আমাদের চারপাশে তাকালে প্রায়ই দেখা যায়, যেকোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, কঠোর পদক্ষেপ বা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের পেছনে একটাই যুক্তি তুলে ধরা হয়—“সংবিধান অনুযায়ী করা হয়েছে।” যেন সংবিধান এক অদৃশ্য শক্তি, যার নামে সবকিছুই বৈধ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এতটা সরল?
সংবিধান কখনোই জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য তৈরি হয়নি। বরং এটি এমন একটি দলিল, যা রাষ্ট্রকে বলে দেয়—কোথায় থামতে হবে, কতদূর পর্যন্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে। সংবিধানের প্রতিটি ধারা মূলত মানুষের মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষিত রাখার জন্যই প্রণীত। কিন্তু যখন সেই ধারাগুলোর ব্যাখ্যা রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়, তখন সংবিধান তার প্রকৃত উদ্দেশ্য হারাতে শুরু করে।
একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—সংবিধান নিজে কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে এর প্রয়োগে। যখন আইনের শাসনের পরিবর্তে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন সংবিধানের দোহাই হয়ে ওঠে একটি ‘ঢাল’, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে বাস্তব অন্যায়। তখন সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে আস্থা হারাতে থাকে—রাষ্ট্রের প্রতি, আইনের প্রতি, এমনকি গণতন্ত্রের প্রতিও।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, যখন জনগণের ন্যায্য দাবি বা প্রতিবাদকে দমন করার জন্যও সংবিধানের ব্যাখ্যা ব্যবহার করা হয়। তখন প্রশ্ন জাগে—সংবিধান কি জনগণের কণ্ঠস্বর রক্ষার জন্য, নাকি সেই কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য?
তবে এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না, সংবিধান ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। এটি ছাড়া শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার এবং অধিকার—সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই সংবিধানকে অস্বীকার নয়, বরং সঠিকভাবে প্রয়োগ করাই হচ্ছে মূল চ্যালেঞ্জ।
আজ সময় এসেছে, সংবিধানকে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে এর চেতনা বাস্তবায়ন করার। সংবিধানের দোহাই দিয়ে নয়, সংবিধানের আত্মাকে ধারণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। কারণ সংবিধান জনগণের জন্য—কোনো ক্ষমতার জন্য নয়।
শেষ কথা একটাই—
সংবিধান যদি জনগণের অধিকার রক্ষা না করে, তবে সেটি কেবল একটি দলিল; আর যদি করে, তবে সেটিই হয়ে ওঠে একটি জাতির শক্তি।
আল আমিন মিলু রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক লেখক এবং আহ্বায়ক গনঅধিকার পরিষদ সরিষাবাড়ি উপজেলা শাখা জামালপুর