প্রদীপ চন্দ্র মম
আজ ২৬ মার্চ—বাংলাদেশের ৫৬তম মহান স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, প্রতিরোধ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের এক অনিবার্য ঘোষণা। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘদিনের শোষণ, বৈষম্য ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার চূড়ান্ত পথে যাত্রা শুরু করে। মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় উত্তাল একটি জাতি সেদিন ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেওয়ার সাহস দেখিয়েছিল।
এর আগের ২৫ মার্চের ভয়াল রাত—ইতিহাসে যা চিহ্নিত হয়েছে এক নির্মম গণহত্যার অধ্যায় হিসেবে—পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর যে দমন-পীড়ন চালায়, তা জাতির স্মৃতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করে। সেই রাতের বিভীষিকা থেকেই জন্ম নেয় প্রতিরোধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে এবং রূপ নেয় সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে। অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াই ছিল একইসঙ্গে মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন বাংলাদেশ। এই অর্জন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন এবং গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক পরিণতি। দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি পর্বই স্বাধীনতার ভিত্তিকে করেছে আরও সুদৃঢ়।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ জনগণ—প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রেখেছেন এই জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে। তাদের আত্মত্যাগ, সাহস ও ঐক্যই স্বাধীনতার বাস্তব ভিত্তি নির্মাণ করেছে, যা আজও জাতির প্রেরণার উৎস।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়েছে। উন্নয়ন, অবকাঠামো, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি দৃশ্যমান। তবে স্বাধীনতার মূল চেতনা—সমতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা—এখনও পূর্ণমাত্রায় প্রতিষ্ঠার অপেক্ষায়। কেবল অর্জনের হিসাব নয়, বরং সেই চেতনার বাস্তবায়নই এখন রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
স্বাধীনতা দিবস তাই শুধুই উদযাপনের উপলক্ষ নয়; এটি আত্মসমালোচনারও সময়। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কতটা ধারণ করা হচ্ছে, রাষ্ট্র ও সমাজ সেই মূল্যবোধ কতটা অনুসরণ করছে—এই প্রশ্নগুলো আজও প্রাসঙ্গিক এবং জরুরি।
স্বাধীনতা টিকে থাকে চেতনা ও দায়বদ্ধতার ওপর। সেই চেতনাকে ধারণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলেই অর্থবহ হবে স্বাধীনতার এই অর্জন। তবেই সম্ভব হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রাকে আরও সুদৃঢ় করা।