প্রদীপ চন্দ্র মম
আজ ২৫ মার্চ—জাতীয় গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনটি বাঙালির ইতিহাসে এক গভীর অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। উদ্দেশ্য ছিল—বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন দমন করা।
সেই রাতে ঢাকা শহর কার্যত পরিণত হয় এক অবরুদ্ধ নগরীতে। ট্যাংক, ভারী অস্ত্র ও মেশিনগানের গর্জনে স্তব্ধ হয়ে যায় জনজীবন। ঘুমন্ত মানুষের ওপর নির্বিচারে হামলা চালানো হয়, কোনো ধরনের সতর্কতা বা মানবিক বিবেচনা ছাড়াই।
বিশেষভাবে টার্গেট করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর চালানো এই হামলা ছিল একটি জাতির বৌদ্ধিক শক্তিকে নিঃশেষ করার সুপরিকল্পিত প্রয়াস।
রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তর এবং পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও একইভাবে হামলা চালানো হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষকে গুলি করে হত্যা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং নির্বিচার দমন-পীড়নে শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে লাশ, ধ্বংস ও আতঙ্ক। নারী, শিশু, বৃদ্ধ—কেউই এই সহিংসতা থেকে রেহাই পায়নি।
ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল একটি সুসংগঠিত গণহত্যা, যার লক্ষ্য ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। কিন্তু এই ভয়াবহ দমন-পীড়ন উল্টো বাঙালির মধ্যে প্রতিরোধের চেতনাকে আরও তীব্র করে তোলে। এর ধারাবাহিকতায় শুরু হয় মহান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—স্বাধীনতার জন্য এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম।
দীর্ঘদিন পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জাতির স্মৃতিতে তা নতুন করে স্থান পায়।
২৫ মার্চ তাই কেবল শোকের দিন নয়; এটি একই সঙ্গে প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার চেতনায় জেগে ওঠার দিন। এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়—অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার শর্ত।
লেখক- কবি ও সাংবাদিক।