প্রদীপ চন্দ্র মম
রাত আজ আর নিস্তব্ধ নয়—রাত আজ অভিযুক্ত।
আকাশ ঝুলে আছে, যেন এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন।
বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ফজা পাগলা—
আজ সে পাগল নয়, আজ সে এক বিস্ফোরণ।
তার চোখ দুটো জ্বলছে—দাউ দাউ আগুনের মতো।
হঠাৎ সে চিৎকার করে ওঠে—
“হিন্দু সমস্যা! ইহুদি সমস্যা! বিধর্মী সমস্যা!
শিয়া সমস্যা! কাদিয়ানি সমস্যা! আহলে কোরআন সমস্যা! আদিবাসী সমস্যা! ইসকন সমস্যা!”
এক মুহূর্ত থামে—তারপর আরও তীব্র, আরও ধারালো—
“মন্দির সমস্যা! মাজার সমস্যা! সুফি সমস্যা! সাধু সমস্যা! বাউল সমস্যা!
রবীন্দ্রনাথ সমস্যা! লালন সমস্যা! রোকেয়া সমস্যা! জাহানারা সমস্যা!”
তার কণ্ঠ এখন ঝড়ের গতিকেও হার মানায়—
“ভালোবাসা সমস্যা! সঙ্গীত সমস্যা! বাদ্যযন্ত্র সমস্যা! নৃত্য সমস্যা! চলচ্চিত্র সমস্যা!
পহেলা বৈশাখ সমস্যা! বাংলা নাম সমস্যা! বসন্ত উৎসব সমস্যা! নাট্যোৎসব সমস্যা! ঘুড়ি উৎসব সমস্যা!”
সে থামে না—সে থামতে জানে না—
“চারুকলা সমস্যা! ভাস্কর্য সমস্যা! মূর্তি সমস্যা!
যুক্তি-প্রশ্ন সমস্যা! মুক্তচিন্তা সমস্যা! মুক্তমনা সমস্যা!
নিরীশ্বরবাদী সমস্যা! অজ্ঞেয়বাদী সমস্যা!”
তার গলা ছিঁড়ে যাচ্ছে—তবুও থামে না—
“নারী সমস্যা! নারীবাদী সমস্যা! নারীর কর্মজীবন সমস্যা!
নারী কমিশন সমস্যা! নারী স্বাধীনতা সমস্যা! নারীর পোশাক সমস্যা!”
এবার তার চোখে রক্ত চড়ে—
“মুক্তিযুদ্ধ সমস্যা! মুক্তিযোদ্ধা সমস্যা!
বঙ্গবন্ধু সমস্যা! সংবিধান সমস্যা! একাত্তর সমস্যা!
শহীদ মিনার সমস্যা! স্মৃতিসৌধ সমস্যা! জাতীয় সঙ্গীত সমস্যা!”
এক নিঃশ্বাসে সব ছুড়ে মারে আকাশের দিকে—
যেন আকাশকেই আসামি করছে।
তারপর হঠাৎ—নীরবতা।
সেই নীরবতা ভেঙে ফিসফিস করে—
“তোমরা সমস্যা বানাতে বানাতে শেষ করে ফেলছো সবকিছু...
ধর্মকে সমস্যা, সংস্কৃতিকে সমস্যা, ইতিহাসকে সমস্যা—
এমনকি ভালোবাসাকেও সমস্যা বানিয়ে ফেলেছো!”
হঠাৎ সে নিজের মাথায় আঘাত করে—
“কিন্তু একটা জিনিস কখনো সমস্যা বলো না—
মানুষের অমানুষ হয়ে যাওয়া!”
তার কণ্ঠ আবার বিস্ফোরিত হয়—
“যে দেশে প্রশ্ন করা অপরাধ—
সেই দেশে জবাবদিহি মরে যায়!
যে দেশে গান সন্দেহভাজন—
সেই দেশে হৃদয় শুকিয়ে যায়!
যে দেশে নারীকে ভয় পায় পুরুষ—
সেই দেশে মানবতা লজ্জায় মরে!”
হাওয়া থমকে যায়।
রাত কেঁপে ওঠে।
ফজা পাগলা দুই হাত তুলে চিৎকার করে—
“আমি পাগল নই!
আমি সেই আয়না—
যেখানে তোমাদের আসল মুখ দেখা যায়!”
তার কণ্ঠ ভেঙে আসে—তবুও আগুন নিভে না—
“সমস্যা একটাই—
তোমরা মানুষ হতে ভয় পাও!”
ধীরে ধীরে সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।
মাটি আঁকড়ে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলে—
“তোমরা ধর্ম বাঁচাও, সংস্কৃতি বাঁচাও, পতাকা বাঁচাও—
কিন্তু মানুষটাকে মারো… প্রতিদিন মারো!”
শেষবারের মতো সে আকাশের দিকে তাকায়—
“এই দেশটা সমস্যা নয়—
এই দেশটাকেই তোমরা সমস্যা বানিয়ে ফেলছো!”
চাঁদের আলো মেঘে ঢেকে যায়।
অন্ধকার আরও ঘন হয়।
আর সেই অন্ধকারে—
ফজা পাগলার হাসি শোনা যায়…
না, সেটা হাসি নয়—
ওটা এক মৃত বিবেকের ভয়ংকর আর্তনাদ।
২১/০৩/২০২৬ খ্রিঃ।