নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি সহায়তার টাকা—যা যাওয়ার কথা দরিদ্র মানুষের ঘরে—সেটি পথেই থেমে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন সরিষাবাড়ীতে জোরালো হয়ে উঠেছে। টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্প ঘিরে উঠা অভিযোগ বলছে, মাঠে কাজ কম, কাগজে উন্নয়ন বেশি; আর মাঝখানে চলছে তথ্য গোপন ও অর্থ কাটাকাটির এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা জানতে গেলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত তথ্য পাওয়া যায় না। তাদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও), ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফলে বরাদ্দ, কাজের মান ও অগ্রগতির প্রকৃত চিত্র জনসম্মুখে আসছে না।
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করেও কাঙ্ক্ষিত তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ একাধিকবার পাওয়া গেছে। আবেদনকারীদের মতে, নির্ধারিত সময় পার হলেও অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে তারা মনে করেন।
বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর অর্থ বণ্টন নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রকল্পে গড়ে ৪০ শতাংশ অর্থ বিভিন্ন খাতে কেটে নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি উঠেছে। এই ৪০ শতাংশের একটি অংশ ‘সাংবাদিক খাত’ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে।
অভিযোগে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শওকত জামিলের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে ও অফিসে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং তদারকির ঘাটতি ও জবাবদিহিতার দুর্বলতার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। প্রকল্প বণ্টন নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৃত দরিদ্রদের পরিবর্তে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের ঘনিষ্ঠরা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন, যা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্যকে ব্যাহত করছে।
উন্নয়ন খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প-সংক্রান্ত সব তথ্য—উপকারভোগীর তালিকা, বরাদ্দের পরিমাণ, কাজের ধরন, বাস্তবায়নকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম ও সময়সীমা—জনসম্মুখে প্রকাশ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত অগ্রগতি হালনাগাদ ও উন্মুক্ত না করলে কাগজে-কলমে উন্নয়নের প্রবণতা কমানো কঠিন হবে। এ ছাড়া অভিযোগ গ্রহণে কার্যকর প্ল্যাটফর্ম, স্বাধীন তদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরিষাবাড়ীর এই পরিস্থিতি এখন বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে—দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ প্রকল্পেই যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে উন্নয়নের দাবি কতটা বাস্তব—সে প্রশ্নই সামনে আসছে। এখন নজর জেলা প্রশাসনের দিকে—অভিযোগগুলো তদন্ত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে কি না। সেদিকেই তাকিয়ে আছে উপজেলার সচেতন মহল।