
প্রদীপ চন্দ্র মম
ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। বছরের পর বছর দাবি উঠেছে, প্রতিশ্রুতি এসেছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ প্রশ্নটি এখন আর কেবল বেতন কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশার ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বাস্তবতা হলো, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন না হওয়ার দায় একক নয়। সরকার, মালিকপক্ষ এবং সাংবাদিক নেতৃত্বের একটি অংশ—এই তিন পক্ষের সমন্বিত ব্যর্থতাই বর্তমান অচলাবস্থার জন্ম দিয়েছে। সরকার একে অগ্রাধিকার দেয়নি, মালিকপক্ষ ব্যয়ের অজুহাতে আপত্তি তুলেছে, আর সাংবাদিক নেতৃত্বের একটি অংশ ধারাবাহিক চাপ তৈরি করতে পারেনি। পরিচয়পত্র বাণিজ্যে জড়িত কিছু সম্পাদক ও প্রশাসনিক গোষ্ঠীর অপতৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এতে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।
ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকারের অনীহার পেছনে একটি বাস্তব কারণ রয়েছে। বেতন কাঠামো স্বচ্ছ হলে জবাবদিহি বাড়ে, সাংবাদিকদের ওপর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের পরিসর সংকুচিত হয়। অন্যদিকে মালিকপক্ষের উদ্বেগও স্পষ্ট—ওয়েজবোর্ড মানে বাড়তি ব্যয় এবং নিয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাংবাদিক সমাজের ভেতরেও একটি অংশ এই পরিবর্তন চায় না। অস্বচ্ছতার মধ্যে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা সহজ; নিয়ম সেই সুবিধা সীমিত করে।
এই পরিস্থিতিতে একটি বিকৃত বাস্তবতা গড়ে উঠেছে। সাংবাদিকতা পেশা ক্রমেই ‘আইডি কার্ডনির্ভর’ হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগের চেয়ে পরিচয়পত্রই হয়ে উঠছে মূল বিষয়। এতে পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, পাশাপাশি গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থাও কমছে। দুর্বল ও অবিশ্বস্ত গণমাধ্যম কোনো গণতন্ত্রের জন্যই শুভ লক্ষণ নয়।
এখানেই ওয়েজবোর্ডের গুরুত্ব। এটি শুধু বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি একটি কাঠামোগত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উপায়। গণমাধ্যমকর্মীদের বেতন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা গেলে ভুয়া নিয়োগ ও অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসতে পারে। এতে কিছু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে নাও পারে, কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান ন্যায্য বেতন দিতে পারে না, তার অস্তিত্বের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
এই প্রক্রিয়ায় দেশের অনেক গণমাধ্যম টিকে থাকতে নাও পারে। তাতে ক্ষতি যতটা, তার চেয়ে বেশি হতে পারে লাভ—কারণ টিকে থাকবে সেসব প্রতিষ্ঠান, যাদের ভিত্তি পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতার ওপর দাঁড়িয়ে। ফলে সাংবাদিকতার মান ও গ্রহণযোগ্যতা—দুটিই বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে এই আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত থেকে যান মফস্বল সাংবাদিকেরা। কম বেতন, অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাব—এই তিন সংকটে তারাই সবচেয়ে বেশি ভোগেন। অথচ দেশের তথ্যপ্রবাহের একটি বড় অংশ এই স্তর থেকেই আসে। তাঁদের বাইরে রেখে কোনো সংস্কারই কার্যকর হবে না।
সমাধান জটিল নয়, কিন্তু বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। বেতন পরিশোধে স্বচ্ছতা, নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কঠোরতা এবং কার্যকর মনিটরিং—এই তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া গেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। এতে ভুয়া পরিচয়ে সাংবাদিকতার সুযোগ কমবে এবং পেশার মানোন্নয়ন ঘটবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায় সদিচ্ছার জায়গায়। ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন কি সত্যিই চাওয়া হচ্ছে, নাকি অচলাবস্থাই কারও কারও জন্য সুবিধাজনক উপায় হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—গণমাধ্যম একটি সুসংগঠিত পেশা হিসেবে এগোবে, নাকি বর্তমানের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থাই চলতে থাকবে। এখন সিদ্ধান্তের সময়—সংস্কার, না কি আপস?
লেখক : কবি ও সাংবাদিক