বিশেষ প্রতিনিধি
কোটা প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর প্রত্যাশা জেগেছিল। কিন্তু সেই বাস্তবতার সঙ্গে যেন সাংঘর্ষিক চিত্র দেখা যাচ্ছে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলায়। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গরিব ও দুস্থ মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি ভিজিএফের চাল বণ্টনে চালু হয়েছে নতুন এক ‘রাজনৈতিক কোটা’। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত দরিদ্রদের পরিবর্তে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ভিজিএফ কার্ডের বড় একটি অংশ। ফলে গরিবের প্রাপ্য চাল যাচ্ছে প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে—যা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ঈদ উপলক্ষে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের জন্য মোট ৩৭৬.০৭০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এই চাল বিতরণের জন্য ৩৭ হাজার ৮০৭টি ভিজিএফ কার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে সুবিধাভোগীর ১০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা। বরাদ্দ অনুযায়ী আওনা ইউনিয়নে ৪ হাজার ৫০৫টি, পিংনায় ৪ হাজার ১৭২টি, পোগলদিঘায় ৬ হাজার ৭৩৫টি, ডোয়াইলে ৫ হাজার ৬৩৪টি, সাতপোয়ায় ৫ হাজার ১৮৯টি, কামরাবাদে ২ হাজার ৫২৫টি, মহাদানে ৪ হাজার ৫৮৫টি এবং ভাটারা ইউনিয়নে ৪ হাজার ২৬২টি কার্ড দেওয়া হয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব কার্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকৃত দরিদ্রদের পরিবর্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও তদারকিতেই এ বণ্টন হচ্ছে।
পোগলদিঘা ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এখানে মোট ৬ হাজার ৭৩৫টি কার্ডের মধ্যে প্যানেল চেয়ারম্যান লাল মিয়া পেয়েছেন ১৮০টি কার্ড। ১২ জন ইউপি সদস্যকে দেওয়া হয়েছে ৯০টি করে মোট ১ হাজার ৮০টি কার্ড। বাকি প্রায় ৫ হাজার ৪৭৫টি কার্ড স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পোগলদিঘা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম রঞ্জু বলেন, ঈদ উপলক্ষে অসহায় মানুষের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে চাল বিতরণের জন্য দলীয়ভাবে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ওয়ার্ড বিএনপি নেতাকে ৪৪০টি করে মোট ৩ হাজার ৯৬০টি কার্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন যুবদল ১৩০টি, ছাত্রদল ৮০টি, স্বেচ্ছাসেবক দল ৮০টি, শ্রমিক দল ৬০টি ও কৃষক দল ৬০টি কার্ড পেয়েছে। উপজেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে ৩০০টি কার্ড।
তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একাংশ এই বণ্টন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেছেন। পোগলদিঘা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য কোহিনূর ইসলাম বলেন, অতীতে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের হাতে ২৫০ থেকে ৩০০টি কার্ড থাকত। এবার দেওয়া হয়েছে মাত্র ৯০টি করে। এতে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতাকে খাটো করে দলীয়ভাবে কার্ড ভাগাভাগির মাধ্যমে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
শুধু পোগলদিঘাই নয়, উপজেলার আওনা, পিংনা, ডোয়াইল, সাতপোয়া, কামরাবাদ, মহাদান ও ভাটারা ইউনিয়নেও একই ধরনের বণ্টনের অভিযোগ উঠেছে। যদিও ডোয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন দাবি করেন, ৫ হাজার ৬৩৪টি কার্ডের মধ্যে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের দেওয়া হয়েছে ৮০০টি কার্ড, যা অতীতের তুলনায় কম। বাকী কার্ড দলীয় নেতাকর্মীরা নিয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি আওনা ইউনিয়নে ভিডাব্লিউভি কার্ডের চাল কেনাবেচা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে স্থানীয় দলীয় কর্মী ও প্যানেল চেয়ারম্যান মিনারা আশরাফ তরফদারের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
সরিষাবাড়ী উপজেলা জামায়াতের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ ভিজিএফ চাল দলীয় কোটায় বণ্টন করলে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশঙ্কা থেকেই যায়। তিনি দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে তালিকা করা হচ্ছে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ আজিম উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধেই আন্দোলন করে নতুন বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে। বিএনপির নাম ব্যবহার করে কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গণঅধিকার পরিষদের সরিষাবাড়ী উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আল আমিন মিলু বলেন, তাদের দল কোনো ভিজিএফ কার্ড পায়নি। তবে দলীয় কোটায় কার্ড বণ্টনের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ‘ওপেন সিক্রেট’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পোগলদিঘা ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ কর্মকর্তা ও উপজেলা পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা রিফাত হোসেন বলেন, রোববার সকাল থেকে ১ হাজার ৮০০ কার্ডধারীর মধ্যে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে বাকি কার্ডধারীদের মধ্যেও চাল বিতরণ করা হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) শওকত জামিলের বক্তব্য জানার জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—দুর্যোগকালীন সহায়তার জন্য বরাদ্দ এই চাল যদি রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে বণ্টিত হয়, তাহলে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে সরকারের সহায়তা কতটা পৌঁছাবে? বিশেষ করে ঈদের আগে এই অভিযোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সরিষাবাড়ীতে।