রমজান আলী মধুপুর ( টাংগাইল) প্রতিনিধি:
টাঙ্গাইলের মধুপুর কালাপাহাড় এলাকায় বন্দুকের নলের মুখে ঘরছাড়া করা হলো একটি গারো পরিবারকে। সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, উচ্ছেদকৃত পরিবারের ঘরবাড়ী ভাংচুর করা হয়েছে। তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থা (বশিউক) ও রাবার উন্নয়ন কতৃপক্ষের এই উচ্ছেদ স্থানীয়দের মনে করিয়ে দিচ্ছে ১৯৭১ সালের সেই ভয়াবহ সময়ের ছবি।

ধারাটি গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী গারোরা বলেছেন, আনসার সদস্যরা মারমুখী আচরণ করেছে এবং উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় দরিদ্র পরিবারের ওপর শারীরিক ও মানসিক জবরদস্তি চালানো হয়েছে। আশির দশকে গজারী বন কেটে প্রায় সাত হাজার একর জমিতে রাবার বাগান স্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে সেই বাগান আর লাভজনক নয়; অনেক জমিতে কলা ও আনারস চাষ হচ্ছে। বনাঞ্চলের বহু জমি ইতিমধ্যেই প্রভাবশালী ভুমিখেকোদের দখলে চলে গেছে। কিন্তু দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ বশিউক দরিদ্র গারো পরিবারটিকে উচ্ছেদের শিকার করেছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, “দরিদ্রদের ওপর নতুন করে অগ্নিকুন্ড জ্বালানো হয়েছে। রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ বন বিভাগের মতোই দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার সর্বোচ্চ সীমা প্রদর্শন করছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এ ধরনের উচ্ছেদ শুধু সম্পত্তির বিরোধ নয়; এটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার, নিরাপত্তা এবং জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত।”
মধুপুর জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন এই এলাকা ইতিমধ্যেই সংবেদনশীল বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
উচ্ছেদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাইলে বনবিভাগ চাঁদপুর রাবার এষ্টেট বাগানের ব্যবস্হাপক আমান উল্লাহ আমান জানান, ৯ মার্চ দুপুরে ধারাটি গ্রামে গারো একটি পরিবার জোরপূর্বক সরকারি জমি দখল করে বাড়ীঘর নিমার্ণ করছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, দিনে দিনে রাবার বাগানের জমি ভুমিখেকোদের দখলে চলে যাচ্ছে। এতে করে বাগানের পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। বাগানের সৌন্দর্য রক্ষার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী আদিবাসী গারো ১১ সন্তানের জনক শৈনিল মারাক জানান, এই জমিতে আমরা যুগের পর যুগ ধরে বসবাস করে আসছি।কোন দিন কারোর সমস্যা হলো না। আর এখন নাকী বন বিভাগের সমস্যা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে আরো বলেন, প্রভাবশালী একটি মহল বনের আনুমানিক ২৪৫ একর জমি বেদখল করে কলা, আনারস চাষ করছে। এতে তাদের কেন সমস্যা হচ্ছে না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই উচ্ছেদকে “দরিদ্র ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নজিরবিহীন নিপীড়ন” হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন- বন, রাবার বাগান এবং কৃষিজমি ব্যবস্থাপনায় সামাজিক ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে দরিদ্র ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ক্রমেই ক্ষমতার স্বৈরাচারিতার শিকার হবে।
উল্লেখ্য, বনবিভাগ ও রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ প্রভাবশালী ভুমিখেকোদের সঙ্গে আঁতাত করে, অসহায় আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর শতাব্দীকাল যাবত বসবাস করা জমি জোরপূর্বক দখলে দিচ্ছে। মধুপুরের আদিবাসী সমাজের ওপর এই ধরনের হস্তক্ষেপ দেশের নৈতিক ও আইনগত দায়বদ্ধতার প্রতি চরম অবহেলা হিসেবে ধরা হচ্ছে।