
প্রদীপ চন্দ্র মম
এই শহরে এখন প্রতিদিন মঞ্চ ওঠে—
লোহার কাঠামোর চেয়েও কঠিন
মিথ্যার স্তম্ভে দাঁড়িয়ে।
মাইকের গর্জনে আকাশ ফেটে যায়,
তবু মাটির নিচে
চাপা পড়ে থাকে মানুষের চিৎকার—
পাথরের মতো ভারী,
অগ্নিগিরির মতো অপেক্ষমাণ।
নেতারা শপথ ছুড়ে দেন—
ফুলের মোড়কে বাঁধা প্রতারণা।
বাতাসে উড়তে উড়তে
পাপড়ি ঝরে যায়;
ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে
লোহা আর কাঁটা—
রক্তমাখা বাস্তবের ধারালো মুখ।
একেক দল একেক রঙে রাঙায় আকাশ—
সবুজে স্বর্গের প্রতিশ্রুতি,
লালে বিপ্লবের আগুন,
নীলে শান্তির মায়া।
কিন্তু রাত নামলেই
সব রঙ গিলে খায়
এক বিশাল কালো মুখ—
ক্ষমতার ক্ষুধার্ত দানব।
মানুষ এখন লাইনে দাঁড়ায়,
কিন্তু তা ভোটের নয়—
অপেক্ষার লাইনে,
বঞ্চনার লাইনে,
ভাঙা স্বপ্নের দীর্ঘ সারিতে।
তাদের কণ্ঠ শুকিয়ে গেছে;
স্লোগান আজ
ভাড়াটে কণ্ঠের ব্যবসা মাত্র।
মুখের ভাষা আর হাতের কাজ—
দুটি সমান্তরাল নয়,
দুটি শত্রু নদী,
যারা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
একই সেতু ভেঙে ফেলে।
যে প্রশ্ন তোলে,
তার কপালে এঁকে দেওয়া হয় বিশ্বাসঘাতকের দাগ।
ধর্মের পতাকা তুলে
তার বুকের ওপর চেপে বসে
উন্মত্ততার ভারী বুট।
কারাগারের শিক
আর জনতার উন্মত্ত পাথর—
দুটোই প্রস্তুত
সত্যকে পিষে ফেলতে।
এই দেশে সত্য এখন
পলাতক কোনো পাখি নয়—
সে আহত,
তার ডানায় গুলির দাগ।
তবু সে উড়ে—
কারণ পতন মানে
নীরবতার চূড়ান্ত জয়।
রাজনীতির মাঠ আজ
খোলা বাজার—
এখানে প্রতিশ্রুতি কেজি দরে বিকোয়,
মানুষ মাপে শতাংশে।
বিবেক বিক্রি হয়
নির্বাচনী ছাড়ে।
জনতা শুধু ক্রেতা নয়—
তাদের রক্তই মুদ্রা,
তাদের ভবিষ্যৎই জামানত।
তবু আগুন নিভে যায়নি—
মাটির গভীরে
অঙ্গারের মতো জ্বলছে ক্ষোভ।
যেদিন মানুষ
নিজের ভয়কে পুড়িয়ে ফেলবে,
মুখোশ ছিঁড়ে ছুঁড়ে দেবে আগুনে,
সেদিন মঞ্চ ভেঙে পড়বে,
মাইকের তার জ্বলে উঠবে বজ্রের মতো।
সেদিন আকাশ রঙ বদলাবে না—
আকাশ হয়ে উঠবে আয়না।
আর সেই আয়নায়
নেতাদের মুখ নয়,
দেখা যাবে মানুষের ক্রুদ্ধ প্রতিচ্ছবি।
সেই দিন আসবেই—
কারণ নীরবতা চিরকাল বন্দী থাকে না।
এই কবিতা অনুরোধ নয়,
এ এক ঘোষণা—
মুখোশভাঙা শহরের
অগ্নিসংবাদ।
২২/০২/২০২৬ খ্রিঃ।