
প্রদীপ চন্দ্র মম
বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের এই দিনে রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে প্রাণ দেন একদল তরুণ শিক্ষার্থী। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠা পায় ভাষার অধিকার; রচিত হয় বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক অনন্য ইতিহাস।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। প্রশাসনিক কাঠামোয় অঞ্চলটির নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান—যদিও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে অনেকেই একে পূর্ব বাংলা বলতেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা ছিল বাংলা।
১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ভাষণ দিতে গিয়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” একই বক্তব্য তিনি ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেও পুনর্ব্যক্ত করেন।
এই ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে (পূর্ব বাংলায়) তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। গড়ে ওঠে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। দাবি ছিল স্পষ্ট—বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
১৯৫২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি জুড়ে আন্দোলন তীব্রতর হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নেন, তারা শান্তিপূর্ণভাবে নিষেধাজ্ঞা ভেঙে মিছিল করবেন।
সেদিন দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে মিছিল বের হলে পুলিশ গুলি চালায়। শহীদ হন আবুল বরকত, আব্দুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল জব্বারসহ আরও অনেকে। রক্তাক্ত রাজপথে পড়ে থাকে তরুণদের নিথর দেহ—আর ইতিহাসে যুক্ত হয় এক নতুন অধ্যায়।
পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি শোকমিছিল ও প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলায়। কয়েক বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়।
ভাষার জন্য জীবনদান বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দেয় বিশ্বও। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সাল থেকে দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রতীক হিসেবে।
প্রতি বছর একুশের প্রথম প্রহরে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নেমে আসে মানুষের ঢল। খালি পায়ে প্রভাতফেরি, শহীদ বেদিতে ফুল অর্পণ—নীরব শ্রদ্ধায় জাতি স্মরণ করে সেই বীর সন্তানদের, যাঁদের রক্তে রক্ষা পেয়েছে মাতৃভাষা।
ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার দাবির লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক স্বাধিকার ও রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতিসত্তার ভিত আরও মজবুত হয়, যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতার আন্দোলনকে বেগবান করে।
আজকের প্রজন্মের কাছে একুশের বার্তা স্পষ্ট—নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা করা মানে আত্মপরিচয় রক্ষা করা। রক্তে লেখা সেই ইতিহাস আমাদের শেখায়, অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের শক্তি কত প্রবল হতে পারে।
রক্তে রাঙানো একুশ আজও উচ্চারণ করে—
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালি কখনো পিছু হটেনি, ভবিষ্যতেও হটবে না।