প্রদীপ চন্দ্র মম
নদীবিধৌত জেলা জামালপুরে নদীভাঙন ও বন্যা এখন আর মৌসুমি দুর্যোগ নয়—বরং এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। যমুনা ও তার শাখানদীগুলোর তীব্র স্রোত, ঘনঘন বন্যা এবং নদীতীর ভাঙনের কারণে জেলার বিস্তীর্ণ জনপদে মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল ও জীবিকার নিরাপত্তা হারাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষায়, “বন্যা আসে, পানি নামে—কিন্তু ভাঙন থামে না।”
জামালপুরের বিভিন্ন উপজেলা—বিশেষ করে ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী—নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় শিকার। গত কয়েক বছরে নদীতীরবর্তী বহু গ্রাম মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতিবার বর্ষা এলে নতুন করে ভাঙনের শঙ্কা তৈরি হয়।
নদীর ধার ঘেঁষে বসবাসকারী পরিবারগুলো বারবার ঘর সরিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। কেউ বাঁধের ওপর, কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে কিংবা উঁচু জমিতে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছে। জমি হারিয়ে অনেকেই দিনমজুর বা শহরমুখী শ্রমজীবী হয়ে উঠছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন্যার পানিতে ডুবে যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তা ও বাজার। অনেক এলাকায় স্কুল বন্ধ থাকে দীর্ঘদিন; শিশুদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হয়।
স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দুর্গম চরাঞ্চলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব প্রকট। পানিবাহিত রোগ, অপুষ্টি ও নিরাপদ পানির সংকট দেখা দেয়।
চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও স্যানিটেশন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দুর্ভোগ বেশি—পানির উৎস নষ্ট হলে দূর থেকে পানি আনতে হয়, আর নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিও বাড়ে।
নদীভাঙন ঠেকাতে কোথাও কোথাও বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে, আবার কোথাও অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু স্রোতের তীব্রতা বেশি হলে এসব প্রতিরোধ ব্যবস্থা টিকতে পারে না। স্থানীয়রা বলছেন, স্থায়ী নদীশাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এই সংকটের সমাধান হবে না।
অনেক জায়গায় নদীতীর রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের পুনর্বাসনও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘ লড়াই
বন্যা ও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ত্রাণ সহায়তা এলেও তা সাময়িক স্বস্তি দেয় মাত্র। জমি-ঘর হারানো মানুষেরা দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনের সুযোগ চান।
চরাঞ্চলের এক বাসিন্দা বলেন, “প্রতি বছর ঘর বানাই, আবার ভাঙে। আমরা কবে স্থায়ীভাবে বাঁচব?”
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, চরবাসীর পুনর্বাসন এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে বন্যা পূর্বাভাস, আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন প্রয়োজন।
জামালপুরের মানুষের জীবনযুদ্ধ যেন নদীর স্রোতের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই। বন্যা ও নদীভাঙন মোকাবিলায় কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এই বিপর্যয় আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে—এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয়রা।