নিজস্ব প্রতিবেদক
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এই একটি প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার বৈধতা, জনগণের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আমাদের বাস্তবতায় কি সত্যিই এমন একটি নির্বাচন হচ্ছে বা হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে?
প্রথমেই আসে অবাধতার প্রশ্ন। অবাধ নির্বাচন বলতে বোঝায়—ভোটার যেন ভয়ভীতি, চাপ বা প্রলোভন ছাড়া নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে। বাস্তবে দেখা যায়, নির্বাচনের আগেই অনেক এলাকায় ভয় ও অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি হয়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মামলা, গ্রেপ্তার, সভা-সমাবেশে বাধা—এসব পরিস্থিতি ভোটারদের মনোজগতে প্রভাব ফেলে। ভোটের দিন কেন্দ্রে যাওয়া না যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সময় নির্ভর করে নিরাপত্তা অনুভূতির ওপর, মতামতের ওপর নয়।
এরপর আসে সুষ্ঠুতার প্রশ্ন। সুষ্ঠু নির্বাচন মানে কেবল ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মনোনয়ন প্রক্রিয়া, প্রচারণার সমান সুযোগ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ভোট গণনার স্বচ্ছতা। কিন্তু নির্বাচনী মাঠে যদি একটি পক্ষ প্রশাসনিক সুবিধা ভোগ করে এবং অন্য পক্ষ সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তবে সেই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু বলা যায়—সে প্রশ্ন থেকেই যায়। সুষ্ঠুতা তখনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যখন ফলাফল নিয়ে ভোটারদের মনে সন্দেহ জন্মায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরপেক্ষতা। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশন যদি পুরোপুরি নিরপেক্ষ না থাকে, তবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো—নিরপেক্ষতার জায়গাটিতেই সবচেয়ে বড় সংকট দেখা যায়। কারণ, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকতে পারে না, তখন নির্বাচন একটি প্রতিযোগিতা না হয়ে ক্ষমতার প্রদর্শনীতে রূপ নেয়।
এখানে আরেকটি বড় বিষয় হলো জনগণের অংশগ্রহণ। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু আয়োজনের মাধ্যমে হয় না, এটি সফল হয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। কিন্তু যদি ভোটার মনে করে তার ভোটের কোনো মূল্য নেই, ফলাফল আগেই নির্ধারিত—তাহলে ভোটকেন্দ্র ফাঁকা থাকবে, আর নির্বাচন কাগজে-কলমে সম্পন্ন হলেও গণতন্ত্র বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই নির্বাচনবিরোধী হওয়া নয়। বরং এই প্রশ্নগুলোই গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন তখনই সম্ভব, যখন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং জনগণের আস্থা—এই তিনটি একসাথে কাজ করে।
আজকের বাস্তবতায় তাই প্রশ্নটা আরও গভীর হয়ে দাঁড়ায়—
আমরা কি সত্যিই ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই,
নাকি শুধু নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করেই দায় সেরে ফেলতে চাই?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—আমাদের নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ।
লেখক গবেষক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং
আহ্বায়ক গনঅধিকার পরিষদ
সরিষাবাড়ি উপজেলা শাখা জামালপুর