নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশ মানে শুধু একটি ভূখণ্ড নয়—দেশ মানে মানুষের আশা, ইতিহাসের দায়, আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। তাই দেশনিয়ে স্বপ্ন দেখাটা আমাদের সবারই স্বাভাবিক প্রবণতা। কেউ স্বপ্ন দেখে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের, কেউ ন্যায়বিচারের, কেউ বা উন্নত অর্থনীতির, আবার কেউ স্বাধীন চিন্তা ও মর্যাদার সমাজের। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়ার যে কৌশলগুলো গ্রহণ করা হয়, সেগুলোর যথার্থ মূল্যায়ন আমরা কতটা করি?
আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে স্বপ্নের অভাব নেই; অভাব রয়েছে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথনকশার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ। প্রায়ই দেখা যায়, লক্ষ্য নিয়ে উচ্চকণ্ঠ আলোচনা হয়, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি কতটা বাস্তবসম্মত, কতটা নৈতিক, কিংবা কতটা টেকসই—সে প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে স্বপ্ন থাকে কাগজে-কলমে, বাস্তবতা থাকে ভিন্ন মেরুতে।
একটি রাষ্ট্র গঠনের কৌশল কখনোই আবেগনির্ভর হতে পারে না। আবেগ মানুষকে আন্দোলিত করে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন সুসংহত পরিকল্পনা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সময়োপযোগী কৌশল। যখন কৌশল নির্ধারণে গবেষণা, পরিসংখ্যান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়ে স্লোগান বেশি গুরুত্ব পায়, তখন স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে জনতার কাছে অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো—কৌশল ব্যর্থ হলে তার দায় নেওয়ার সংস্কৃতি নেই। আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি, কোনো পরিকল্পনা কাজ না করলে তার কারণ অনুসন্ধানের বদলে দায় চাপানো হয় ব্যক্তি, দল বা পরিস্থিতির ওপর। কৌশলের ভুলগুলো চিহ্নিত না করলে সেগুলো শুধরানোর সুযোগও তৈরি হয় না। ফলে একই ভুল ঘুরেফিরে বারবার ঘটে, আর দেশ এগোয় না, কেবল ঘুরপাক খায়।
দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কৌশল মূল্যায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জনসম্পৃক্ততা। কৌশল যদি জনগণের বাস্তব চাহিদা ও সক্ষমতার সঙ্গে সংযুক্ত না থাকে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে টিকে না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ নিজেকে সেই উন্নয়নের অংশ মনে করে। উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া পরিকল্পনা যতই আকর্ষণীয় হোক, বাস্তবে তা ভেঙে পড়ে মানুষের অংশগ্রহণের অভাবে।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—স্বপ্ন আর কৌশলের মধ্যে সততার সেতুবন্ধন। দেশনিয়ে স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার আছে, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের নামে যদি ভ্রান্ত কৌশল, ক্ষমতার অপব্যবহার বা নৈতিক বিচ্যুতি ঘটে, তাহলে স্বপ্নের ভাষাও কলুষিত হয়। তখন দেশপ্রেম পরিণত হয় মুখের বুলি আর পোস্টারের স্লোগানে।
সবশেষে বলা যায়, দেশনিয়ে স্বপ্ন দেখা অপরাধ নয়—বরং প্রয়োজনীয়। তবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কৌশলগুলোর নিরপেক্ষ, সাহসী ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন জরুরি। স্বপ্ন কত সুন্দর, তা নয়; প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা যে পথে হাঁটছি, সেই পথ কি সত্যিই আমাদের কাঙ্ক্ষিত দেশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্ন করতে শেখার দিনই প্রকৃত দেশচিন্তার সূচনা হবে।
আল আমিন মিলু
রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক লেখক