
নিজস্ব প্রতিবেদক
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন আ্যন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেডের চুক্তি অনুযায়ী যমুনা সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ না করায় ১০ দিনে ক্ষতি ৫০ কোটি টাকা। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া ছিল কেবল সূচনা। এরপর একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত, গোপন বৈঠক, যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়া এবং কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ বদলের অভিযোগ—সব মিলিয়ে যমুনা সার কারখানা এখন শুধু উৎপাদন সংকটে নয়, বরং এক গভীর প্রশাসনিক ও কারিগরি সংকটের মুখে। কারখানার ভেতরে কী ঘটেছে—তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে, কিন্তু স্পষ্ট জবাব মিলছে না।
কারখানা সূত্রে জানা যায়, ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গ্যাসের চাপ হঠাৎ করে ৮ কেজিতে নেমে আসে। এ অবস্থায় বুস্টার স্ট্রিপ করলে বিকট শব্দে যন্ত্রপাতিতে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু এর পরের ঘটনাগুলোই পরিস্থিতিকে করে তোলে আরও ভয়াবহ।
মেরামতের সময় ভুল করে পানির লাইনে এসিড সরবরাহ—এই তথ্য এখন আর গুঞ্জন নয়, বরং কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও আংশিকভাবে স্বীকৃত। এসিড মিশ্রিত পানি কারখানার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে ছড়িয়ে পড়ায় সেগুলোর কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ শ্রমিকদের।
কারখানায় কর্মরত একাধিক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এসিড লাগার পর যন্ত্রপাতির টেম্পার নষ্ট হয়ে গেছে—এই অজুহাতে একের পর এক যন্ত্রাংশ বাতিল ঘোষণা করা হচ্ছে। বাস্তবে অনেক যন্ত্র এখনও ব্যবহারযোগ্য, কিন্তু সেগুলো বদলের তালিকায় ঢুকছে।”
তাঁদের অভিযোগ, এরই মধ্যে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি গোডাউন খালি করে পুরোনো যন্ত্রাংশ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির প্রস্তুতিও চলছে। প্রশ্ন উঠেছে—এসব সিদ্ধান্ত কি প্রকৃত কারিগরি প্রয়োজন থেকে, নাকি ভিন্ন কোনো স্বার্থ জড়িত?
এ বিষয়ে যমুনা সার কারখানার জিএম (অপারেশন) মোঃ ফজলুল হক বলেন,
“বুস্টার স্ট্রিপের কারণে কিছু বাল্বে লিকেজ হয়েছিল। সেই লিকেজ দিয়ে এসিড মিশ্রিত পানির সংস্পর্শে এসে কিছু যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে—এটা সত্য। তবে বুস্টার মেরামত করা হয়েছে এবং বর্তমানে কোনো সমস্যা নেই।”
তিনি আরও দাবি করেন, অ্যামোনিয়া ইউনিট চালু রয়েছে এবং গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হলে যে কোনো সময় ইউরিয়া উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পুরো ঘটনা ঘিরে ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে কারখানার শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের পর থেকেই অ্যামোনিয়া ইউনিট চালু রেখে ইউরিয়া ইউনিটের সব কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি। বরং এতে করে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে—তাহলে কি ইউরিয়া ইউনিটের ক্ষয়ক্ষতি সরকারিভাবে স্বীকার করতে গড়িমসি করা হচ্ছে? নাকি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্রয় ও মেরামত প্রকল্পের পথ তৈরি করা হচ্ছে?
যমুনা সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোঃ আফাস উদ্দিনের সাথে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মুঠোফোনে বারবার কল করলেও তাতে তিনি সাঁড়া দেননি।
জামালপুর জেলা বিএফএ’র সাবেক সভাপতি চান মিয়া চানু বলেন, গ্যাসের চাপ সল্পতায় ২২ জানুয়ারী ২০২৬ কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে করে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১০ দিনে উৎপাদন না হওয়ায় কারখানার ক্ষতি হয়েছে আনুমানিক ৫০ কোটি টাকা। সেই সাথে ইরি-বোরো মৌসুমে সারের ঘাটতি হতে পারে এমন আশঙ্কার কথাও বলেন তিনি।
উল্লেখ্য, গ্যাস সংকটের কারণে ২৩ মাস উৎপাদন বন্ধ থাকার পর গত ২৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড যমুনা সার কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেয়। এরপর ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ কারখানা উৎপাদনে যেতে সক্ষম হয়।
কিন্তু মাত্র এক মাস গ্যাসের চাপ সল্পতার দায় নিয়ে কারখানা উৎপাদনে থাকলেও ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গ্যাসের চাপ ৮ কেজিতে নেমে আসায় কারখানার বয়লার স্ট্রিপ করে উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে—এত দীর্ঘ প্রস্তুতি ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের সাথে দ্বিগুণ দাম দিয়ে গ্যাস কেনার চুক্তি করার পরও কেন কারখানাটি টেকসইভাবে চালু রাখা গেল না?
যমুনা সার কারখানা দেশের অন্যতম প্রধান ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এখানে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, জাতীয় পর্যায়ে সারের সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অথচ এসিড–পানির মতো গুরুতর ঘটনার পরও কোনো স্বাধীন তদন্ত কমিটি বা দায় নির্ধারণের উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
এটি কি নিছক একটি দুর্ঘটনা, নাকি ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিহীনতার ফল?
এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে যমুনা সার কারখানার ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চিত থাকবে, তেমনি প্রশ্নবিদ্ধ হবে রাষ্ট্রীয় শিল্প ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতাও।