নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানেই একসময় ছিল জনজোয়ার, আলোচনা, উত্তেজনা আর প্রত্যাশার ঢেউ। পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই ঘুরে বেড়াত ভোটের হাওয়া। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে এসেও সেই পরিচিত আমেজ চোখে পড়ছে না। নেই আগ্রহ, নেই উত্তাপ, নেই জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের দৃশ্যমান প্রস্তুতি। প্রশ্ন উঠছে—এই নিস্তব্ধতার কারণ কী?
প্রথমত, বিশ্বাসের সংকট। গত কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি গভীর অনাস্থা তৈরি করেছে। ভোট দিলেই কি ভোটের মূল্য থাকবে—এই প্রশ্নের উত্তর মানুষ নিশ্চিতভাবে পাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটের দিন মাঠের বাস্তবতা—সব মিলিয়ে সাধারণ ভোটার নিজেকে ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক ভাবতে শুরু করেছে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অভাব। কার্যকর বিরোধী অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন জনগণের কাছে উৎসবে পরিণত হয় না, বরং আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়। যখন বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট চরমে, সংলাপের পথ বন্ধ, তখন নির্বাচন আর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক থাকে না। ফলে ভোটার ভাবে—ফল যদি আগেই নির্ধারিত, তবে অংশগ্রহণের প্রয়োজন কী?
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, জীবিকার সংগ্রাম—এই বাস্তবতায় মানুষের অগ্রাধিকার তালিকায় রাজনীতি অনেক নিচে নেমে গেছে। মানুষ এখন ভোটের হিসাব নয়, মাসের বাজারের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। রাজনৈতিক দলগুলোও এই বাস্তব কষ্টকে নির্বাচনী ভাষ্যে যথাযথভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে।
চতুর্থত, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক বার্তার দুর্বলতা। ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে কোনো নতুন স্বপ্ন, কোনো শক্তিশালী নীতি-ভিত্তিক বিকল্প হাজির হয়নি। পুরনো স্লোগান, পুরনো অভিযোগ আর ক্ষমতার হিসাব—এই চক্রে আটকে আছে রাজনীতি। তরুণ প্রজন্ম, যারা একসময় পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, তারাও এখন উদাসীন।
সবশেষে বলতে হয়, এই “আমেজহীনতা” হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চর্চার ফল। যদি নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে অর্থবহ করতে হয়, তবে প্রয়োজন আস্থা পুনর্গঠন, সমতাভিত্তিক রাজনৈতিক মাঠ, এবং জনগণের বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে রাজনীতির পুনর্নির্মাণ। নইলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাসে স্মরণীয় হবে ভোটের উৎসব হিসেবে নয়, বরং জনগণের নীরব দূরত্বের একটি উদাহরণ হিসেবে।
এই নীরবতাই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
গবেষক লেখক এবং
আহ্বায়ক গনঅধিকার পরিষদ
সরিষাবাড়ি উপজেলা শাখা জামালপুর