নিজস্ব প্রতিবেদক
নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব—এ কথা বইয়ের পাতায় যতটা সুন্দর, বাস্তবে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস ততটাই রক্তাক্ত ও অস্থির। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও নির্বাচনী সহিংসতার খবর আসতে শুরু করেছে, যা আমাদের অতীত অভিজ্ঞতাকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশে নির্বাচন কেন বারবার সহিংস হয়ে ওঠে, আর এই সহিংসতার শিকড় কোথায়?
বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। স্বাধীনতার পরপরই সেই নির্বাচন ছিল একতরফা ও উত্তেজনাপূর্ণ। এরপর ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনগুলো সামরিক বা আধা-সামরিক শাসনের ছায়ায় অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত, আর সহিংসতা ও কারচুপির অভিযোগ ছিল নিত্যসঙ্গী। ফলে জনগণের ভোটাধিকার তখনই প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনকে অনেকেই তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেন। দীর্ঘ আন্দোলনের পর গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন হলেও নির্বাচনী সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে সবচেয়ে বড় বাঁক আসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর পর। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কেন্দ্র দখল, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং পরবর্তী সহিংসতা সেই নির্বাচনী সাফল্যকে অনেকটাই ম্লান করে দেয়।
২০০৬-২০০৮ সালের রাজনৈতিক সংকট ও জরুরি অবস্থার সময় নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলেও ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়। ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হওয়া সংসদ, সহিংস আন্দোলন, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানি—সব মিলিয়ে নির্বাচন মানেই তখন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়ায়।
২০১৮ সালের নির্বাচনেও সহিংসতার মাত্রা তুলনামূলক কম থাকলেও ভোটের আগের রাত, প্রশাসনের ভূমিকা ও ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলে সহিংসতা শুধু শারীরিক আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, গণতান্ত্রিক আস্থার ওপরও আঘাত হেনেছে।
বাংলাদেশে নির্বাচনী সহিংসতার মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ও ‘জয়ীই সব, পরাজিত কিছুই না’—এই রাজনৈতিক মানসিকতা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্রের অভাব এবং ক্যাডারনির্ভর রাজনীতি। তৃতীয়ত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিনের অনাস্থা। আর চতুর্থত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি—যেখানে নির্বাচনী সহিংসতার দায়ীরা প্রায়শই শাস্তির বাইরে থেকে যায়।
নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা শুধু প্রাণহানি বা সম্পদ ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। জনগণ ভোট দিতে ভয় পায়, তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আর গণতন্ত্র পরিণত হয় কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায়।
আজ যখন আবার নির্বাচনী সহিংসতার খবর আসছে, তখন অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিকল্প নেই। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, সব দলের জন্য সমান সুযোগ, প্রশাসনের দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স—এগুলো কেবল স্লোগান নয়, বাস্তবায়নের প্রশ্ন। নইলে ইতিহাস আবারও প্রমাণ করবে, বাংলাদেশে নির্বাচন আসে—কিন্তু গণতন্ত্র বারবার রক্তাক্ত হয়।
আল আমিন মিলু
রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক লেখক এবং আহ্বায়ক গনঅধিকার পরিষদ
সরিষাবাড়ি উপজেলা শাখা জামালপুর