নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর চালু হওয়া দেশের বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (JFCL) আবারও উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ একটাই
অতিরিক্ত মূল্যে গ্যাস কিনেও প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়া।
এই বাস্তবতা শুধু একটি কারখানার ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, শিল্পনীতি ও কৃষি নিরাপত্তার গভীর সংকটের নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
কারখানার সক্ষমতা বনাম বাস্তবতা
যমুনা সারকারখানার দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭০০ টন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই কারখানা বছরে কয়েক লাখ টন ইউরিয়া সরবরাহ করে দেশের কৃষি খাতকে শক্ত ভিত দেয়।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—
গ্যাসের চাপ কম থাকায় প্ল্যান্ট নিরাপদভাবে চালানো যাচ্ছে না
কখনো আংশিক উৎপাদন, কখনো পুরোপুরি বন্ধ
ফলে পরিকল্পিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বারবার ব্যাহত হচ্ছে
শিল্প কারিগরি দিক থেকে সারকারখানা ‘অন-অফ’ সুইচের মতো নয়। একবার বন্ধ হলে পুনরায় চালু করতে সময়, অর্থ ও বিপুল গ্যাসের অপচয় হয়।
অতিরিক্ত মূল্যে গ্যাস কিনেও কেন উৎপাদন নেই?
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সারকারখানাগুলোকে আগের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
সমস্যা হলো—
দাম বাড়লেও সরবরাহের স্থায়িত্ব ও চাপ নিশ্চিত করা হয়নি
গ্যাস থাকলেও প্রয়োজনীয় PSI না থাকায় উৎপাদন অসম্ভব
ফলাফল:
গ্যাসের জন্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে
কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে না
অর্থাৎ ডাবল ক্ষতি
এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ তৈরি করছে।
লাভ-ক্ষতির বাস্তব হিসাব
সরকারি হিসাবে—
প্রতি কেজি ইউরিয়া উৎপাদনে খরচ প্রায় ৩৮ টাকা
কৃষকদের জন্য বিক্রয়মূল্য নির্ধারিত ২৫ টাকা
অর্থাৎ প্রতি কেজিতে সরকারকে দিতে হয় ১৩ টাকা ভর্তুকি।
কিন্তু যখন উৎপাদনই বন্ধ থাকে—
ভর্তুকির সুফল কৃষক পায় না
আমদানিনির্ভরতা বাড়ে
আমদানিকৃত সারের দাম অনেক বেশি পড়ে
বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে
এতে রাষ্ট্রীয় ক্ষতির অঙ্ক কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
শ্রমিক, স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক প্রভাব
যমুনা সারকারখানা শুধু একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র।
উৎপাদন বন্ধ মানে—
শত শত শ্রমিকের কাজ অনিশ্চিত
পরিবহন, সরবরাহ ও স্থানীয় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত
পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চাকা ধীর হয়ে যাওয়া
এই ক্ষতির হিসাব কখনো বাজেটের খাতায় ধরা পড়ে না, কিন্তু সমাজে এর অভিঘাত গভীর।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন
ইউরিয়া সার দেশের খাদ্য উৎপাদনের মেরুদণ্ড।
যখন দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হয়—
বোরো ও আমন মৌসুমে সরবরাহে চাপ পড়ে
কৃষকের সময়মতো সার না পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়
খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে
একটি সারকারখানা বন্ধ মানে, পরোক্ষভাবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা দুর্বল হওয়া।
করণীয় কী?
এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন—
গ্যাস সরবরাহে চাপ ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা, শুধু সংযোগ নয়
সারকারখানাকে শিল্প হিসেবে অগ্রাধিকার খাতে রাখা
উৎপাদন বন্ধের দায় নির্ধারণে জবাবদিহি নিশ্চিত করা
দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানি ও আধুনিক প্রযুক্তি বিনিয়োগ
আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনকে রক্ষা করা
উপসংহার
যমুনা সারকারখানার উৎপাদন বন্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি প্রমাণ করে—
পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সমন্বয় নেই।
দাম বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি।
গ্যাস আছে অথচ চাপ নেই—এই বৈপরীত্যের মাশুল দিচ্ছে রাষ্ট্র, কৃষক এবং সাধারণ মানুষ।
এই সংকটকে অবহেলা করলে ক্ষতির সার কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা ছড়িয়ে পড়বে পুরো অর্থনীতি ও খাদ্য ব্যবস্থায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক লেখক এবং আহ্বায়ক গনঅধিকার পরিষদ সরিষাবাড়ি উপজেলা শাখা জামালপুর