নিজস্ব প্রতিবেদক
যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে (জেএফসিএল) দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগে নীতিমালা ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারখানার উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে তিন সদস্যের প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)। একই সঙ্গে গত তিন মাস ধরে বেতন না পেয়ে চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন ২৩৯ জন দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিক। এই পরিস্থিতি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাটির শ্রমিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বিসিআইসির উপ-মহাব্যবস্থাপক (ক্রয়) ও তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব মুহাম্মদ আব্দুস ছালাম এ বিষয়ে একটি নোটিশ জারি করেন। গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক-বিপণন) কাজী আনোয়ার হোসেনকে। অপর সদস্য হিসেবে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রসায়ন) মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম মজুমদার। নোটিশ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল-মমিন আউটসোর্সিং সার্ভিসেস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মমিনুল ইসলামের বক্তব্য গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগে বলা হয়, ‘দৈনিক ভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণ নীতিমালা–২০২৫’ অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যমুনা সার কারখানায় শ্রমিক নিয়োগের জন্য আল-মমিন আউটসোর্সিং সার্ভিসেস লিমিটেডকে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নীতিমালা অনুযায়ী কারখানা চালু থাকলে ২৩৯ জন এবং বন্ধ থাকলে ১৬৫ জন শ্রমিক নিয়োগের বিধান থাকলেও বাস্তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাত্র ২৪ জন শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ পায়। অভিযোগকারীর দাবি, উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন নীতিমালা ও চুক্তি উপেক্ষা করে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে কারখানা কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, যমুনা সার কারখানা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিকরা কখনো ঠিকাদারের মাধ্যমে, কখনো সরাসরি কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে কাজ করে আসছেন। ২০২৪ সালেও পাঁচ শতাধিক শ্রমিক এভাবে কাজ করেছেন। উৎপাদন বন্ধ ও কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় পরবর্তীতে শ্রমিকের সংখ্যা কমে ২৩৯ জনে নেমে আসে। কর্তৃপক্ষের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চেকের মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতনের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল-মমিন আউটসোর্সিং সার্ভিসেস লিমিটেড এখনো শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করেনি। বেতন না দেওয়ার বিষয়টি আড়াল করতেই প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনা হয়েছে বলেও কর্তৃপক্ষের দাবি।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক জানান, টানা তিন মাস ধরে বেতন না পেয়ে তারা খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছেন না। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন।
শ্রমিক নিয়োগে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বেতন পরিশোধে ব্যর্থতা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বিসিআইসির তদন্ত কমিটির দিকেই তাকিয়ে আছেন শ্রমিক, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট মহল। তদন্তে কী উঠে আসে এবং বেতন না দেওয়ার দায় কার ওপর বর্তায়—তা নির্ধারণই এখন মূল প্রশ্ন। রাষ্ট্রায়ত্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকারখানায় শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি না, সেটিই নির্ভর করছে এই তদন্তের ফলাফলের ওপর।