প্রদীপ চন্দ্র মম
ডিজিটাল যুগে সংবাদ আর অপেক্ষা করে না—এটি এখন প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। কোনো ঘটনা ঘটার মুহূর্তেই তা মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, ইউটিউবে শুরু হয় বিশ্লেষণ। এই পরিবর্তনের ফলে কাগুজে সংবাদপত্রের পাঠক কমেছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের চাপ কেন সবচেয়ে বেশি পড়েছে স্থানীয় সংবাদপত্রের ওপর? এটি কি কেবল পাঠকের অনীহা, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত উপেক্ষা?
স্থানীয় সংবাদপত্রের বর্তমান সংকট শুধু সময়ের সঙ্গে তাল না মেলানোর ফল নয়। এটি রাষ্ট্রীয়, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক উদাসীনতার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরিণতি। ‘এগুলো আর কয়জনই বা পড়ে’—এই ধারণা আজ শুধু সাধারণ পাঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; প্রশাসন, রাজনীতি এবং জাতীয় গণমাধ্যমের একটি অংশের মধ্যেও তা দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। এই মনোভাবই স্থানীয় সংবাদপত্রকে গুরুত্বহীন করে তোলার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। একটি উপজেলার ভাঙাচোরা সড়ক, হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, ভূমি অফিসের দুর্নীতি কিংবা থানার গাফিলতির মতো বিষয় জাতীয় দৈনিকের পাতায় নিয়মিত জায়গা পায় না। এসব ঘটনা প্রথম উঠে আসে স্থানীয় সংবাদপত্রেই। কিন্তু সেসব প্রতিবেদনের পর যদি কোনো প্রতিকার না হয়, যদি কোনো জবাবদিহি তৈরি না হয়, তাহলে পাঠকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এই কাগজ পড়ে কী পাওয়া গেল?
এর বিপরীতে জাতীয় দৈনিকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যায়। ফাইল নড়ে, তদন্ত কমিটি হয়, ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। কিন্তু একই অনিয়ম স্থানীয় সংবাদপত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পেলেও অনেক সময় প্রশাসন নীরব থাকে। এই বৈষম্য কাকতালীয় নয়; এটি একটি কাঠামোগত দ্বৈত মানদণ্ডেরই প্রকাশ।
এই দ্বৈত আচরণই স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রতি পাঠকের আস্থা ক্ষয় করে। স্থানীয় পত্রিকা তখন পাঠকের চোখে এমন এক মাধ্যমে পরিণত হয়, যেখানে সত্য বলা যায়—কিন্তু তার কোনো দৃশ্যমান ফল নেই। এই বাস্তবতা সৃষ্টির দায় প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম তাদের অস্বস্তিতে ফেলে, কিন্তু স্থানীয় পত্রিকার প্রতিবেদন উপেক্ষা করা তুলনামূলক সহজ। অনেক ক্ষেত্রেই এই উপেক্ষা সচেতন ও পরিকল্পিত। এর খেসারত দিতে হয় স্থানীয় সাংবাদিকদের। হুমকি, চাপ, মামলা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে একঘরে করে রাখার সংস্কৃতি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ফলে সংবাদ আপসকামী হয়, শিরোনাম নরম হয়, সত্যের ধার ভোঁতা হয়ে আসে। এই পরিস্থিতি আকস্মিক নয়; বরং ক্ষমতার জন্য এটি সুবিধাজনক এক বাস্তবতা।
তবে স্থানীয় সংবাদপত্রের দায়ও অস্বীকার করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই পেশাদারিত্বের ঘাটতি, যাচাইহীন সংবাদ, রাজনৈতিক পক্ষপাত কিংবা বিজ্ঞাপনদাতার প্রভাব পাঠকের আস্থা নষ্ট করেছে। একসময় স্থানীয় সংবাদপত্র ছিল জনপদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল; আজ অনেক পাঠকের কাছে তা ‘পক্ষের কাগজ’ হিসেবে চিহ্নিত। এই বিশ্বাসহীনতা দূর না হলে স্থানীয় সংবাদপত্রের পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো—জাতীয় সংবাদপত্রে কর্মরত অনেক সাংবাদিকের মধ্যেই স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রতি একধরনের অবজ্ঞা রয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, জাতীয় সাংবাদিকতার বড় একটি অংশই উঠে এসেছে স্থানীয় সংবাদপত্রের মাঠ থেকে। এই শেকড় অস্বীকার করা শুধু অনৈতিক নয়, পেশাগত দিক থেকেও আত্মঘাতী। শক্তিশালী জাতীয় গণমাধ্যম গড়ে তুলতে হলে শক্তিশালী স্থানীয় সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও স্থানীয় সংবাদপত্র আজ বন্দী। পাঠকসংখ্যা কম, বিজ্ঞাপননির্ভরতা বেশি, আর রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন বণ্টনে বৈষম্য প্রকট। এর ফলে সাংবাদিকরা ন্যায্য পারিশ্রমিক পান না, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ হয় না, ডিজিটাল মাধ্যমে পেশাদার উপস্থিতি গড়ে তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে তৈরি হয় এক দুষ্টচক্র—অর্থের অভাবে মান কমে, মান কমলে পাঠক কমে, আর পাঠক কমলে অর্থ আসে না।
পরিশেষে বলা যায়, স্থানীয় সংবাদপত্রের সংকটকে কেবল ‘পাঠকের অনীহা’ বলে ব্যাখ্যা করা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এটি মূলত ক্ষমতার উপেক্ষা, প্রশাসনিক দ্বৈততা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পেশাগত দুর্বলতার সম্মিলিত ফল। স্থানীয় সংবাদপত্র দুর্বল হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি শিল্প নয়; সমাজ হারায় তার সবচেয়ে কাছের নজরদারি ব্যবস্থা। গণতন্ত্র দুর্বল হয় নীরবে।
প্রশ্ন তাই একটাই—আমরা কি সেই আয়নাটিকে ভাঙতে দেব, নাকি সময় থাকতে সেটিকে আবার পরিষ্কার করে তাতে নিজেদের মুখ দেখার সাহস করব? লেখক: কবি ও সাংবাদিক