নিজস্ব প্রতিবেদক
গণঅধিকার পরিষদের জন্ম হয়েছিল এক ধরনের রাজনৈতিক আশার প্রতীক হয়ে। ছাত্র আন্দোলনের ভেতর থেকে উঠে আসা এই শক্তি রাজনীতিতে নৈতিকতা, সাহস আর বিকল্প নেতৃত্বের বার্তা দিয়েছিল। সাধারণ মানুষ ভেবেছিল—হয়তো এবার পুরনো রাজনীতির বৃত্ত ভাঙবে, সুবিধাবাদ আর আপসের রাজনীতির বাইরে গিয়ে কথা বলবে নতুন কোনো শক্তি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সেই প্রত্যাশার তীরে এসে কি গণঅধিকার পরিষদ নিজের তরী নিজেই ডুবিয়েছে?
প্রথমত, রাজনৈতিক অবস্থানের অস্পষ্টতা।
গণঅধিকার পরিষদ বারবার এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে তাদের “বিকল্প শক্তি” পরিচয় ঝাপসা হয়ে গেছে। কখনো সরকারবিরোধী কঠোর ভাষা, আবার কখনো কৌশলগত নীরবতা—এই দ্বৈততা কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। রাজনীতিতে কৌশল থাকা দরকার, কিন্তু অবস্থান যদি স্পষ্ট না হয়, তাহলে মানুষ আস্থা হারায়।
দ্বিতীয়ত, আন্দোলন থেকে সংগঠনে রূপান্তরের ব্যর্থতা।
আন্দোলন করা আর দল হিসেবে টিকে থাকা এক জিনিস নয়। আন্দোলনের আবেগকে সংগঠনের শৃঙ্খলায় রূপ দিতে না পারলে দল দুর্বল হয়ে পড়ে। গণঅধিকার পরিষদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে—মাঠের কর্মী, তৃণমূল নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। ফলে যে শক্তি একসময় রাজপথ কাঁপিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে সীমিত পরিসরে আটকে গেছে।
তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্ব সংকট।
দলের ভেতরের মতভেদ প্রকাশ্যে চলে আসা সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আদর্শিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তা যদি প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের চোখে দলটি অনভিজ্ঞ ও অপরিপক্ব বলে মনে হয়। নেতৃত্বের ঐক্যহীনতা রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধাক্কা দেয়।
চতুর্থত, জনগণের প্রত্যাশা বনাম বাস্তব রাজনীতি।
গণঅধিকার পরিষদ যে ভাষায় শুরু করেছিল—দুর্নীতি, দুঃশাসন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই—বাস্তবে সেই ভাষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। জনগণ শুধু বক্তব্য নয়, কার্যকর রাজনৈতিক রূপরেখা দেখতে চায়। সেই জায়গায় দলটি এখনো পরিপূর্ণ বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
তবে এখানেই সব শেষ নয়।
রাজনীতিতে “তীরে এসে তরী ডোবা” মানেই চিরতরে ডুবে যাওয়া নয়। আত্মসমালোচনা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারলে গণঅধিকার পরিষদ আবারও বিশ্বাস ফেরাতে পারে। প্রশ্ন হলো—তারা কি সেই সাহসী আত্মসমালোচনার পথে হাঁটবে, নাকি সময়ের স্রোতে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে?
গণঅধিকার পরিষদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একটাই—
তারা কি সত্যিই বিকল্প রাজনীতি করতে চায়, নাকি প্রচলিত রাজনীতির ভিড়ে আরেকটি নাম হয়ে থাকতে চায়?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, তরী ডুবলো নাকি আবার নতুন করে
আল আমিন মিলু
রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক লেখক